মুত্তাক্বীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

  • Jamia Admin
  • Friday 28, 2017
  • প্রবন্ধ

সরল অনুবাদঃ পরম করুণাময় মহান আল্লাহর নামে।

“আলিফ লা-ম মীম। ঐ কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই। মুত্তাক্বী দের জন্যে পথ প্রদর্শন কারী। যারা ‘ইলমুল গায়ীব বা অদৃশ্য বিষয়ে ঈমান আনে, সালাত ক্বায়িম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে। আর তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের উপর নাযিল করা হয়েছে, তারা তাতে ঈমান আনে ও আখিরেতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস করে। তারা তাদের প্রভুর হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারাই সফলকাম। (সুরা আল-বাক্বারা, ২;১-৫)

দারসের বিষয়বস্তুঃ এ দারসে সুরা আল-বাক্বারার প্রথম ৫টি আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের বিশেষত্ব এই যে, এটি কোথাও ‘আম’ বা সাধারন এবং কোথাও ‘খাস’ বা বিশেষ হিদায়াতের কথা বলা হয়েছে। এ জন্যই হিদায়াতের সাথে মুত্তাক্বীদেরকে বিশেষ ভাবে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এই কথা স্বতঃসিদ্ধ  যে, হিদায়াতের কোন শ্রেনি-সীমা নেই। আলোচ্য আয়াতসমূহে মুত্তাক্বী বান্দাদের কতিপয় বিশেষ গুনাবলীর কথা উল্লেখিত হয়েছে। আল-কুরআনের বাহকদের এ সকল গুনে গুণান্বিত হওয়া জরুরী। তবেই উভয় জগতের সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

সূরা আল-বাক্বারা’র ফজিলতঃ আল-কুরআনের বহু বিধি-বিধান সম্বলিত সুরা হচ্ছে সুরা আল-বাক্বারাহ। এ সূরাটির ফজিলত ও মাহাত্ম্য অনেক। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “তোমরা নিজেদের ঘরকে কবর বানিও না। যে ঘরে সুরা আল-বাক্বারা পাঠ করা হয়, সে ঘরে শয়তান প্রবেশ করেনা।” (সহিহ মুসলিম-হাঃ৭৮০)

অপর বর্ণনায় এসেছে- “তোমরা কুরআন পাঠ করতে থাকো, কারন তা ক্বিয়ামতের দিন তার পাঠকের জন্যে সুপারিশ করবে। দু’টি জ্যোতির্ময় সুরা আল-বাক্বারা ও আলে ‘ইমরান পড়তে থাকো, এ সূরা দুটি ক্বিয়ামতে দু’টো সামিয়ানা বা মেঘ্স্বরূপ বা পাখির বিশাল দু’টো ঝাঁক হিসেবে আসবে এবং তার পাঠকের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবে। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেনঃ “সুরা আল-বাক্বারা পড়তে থাকো, কেননা এর পাঠে বরকত রয়েছে এবং তা বর্জন করা আফসোসের কারন। আর জাদুর শক্তি এর উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবেনা “ (সহিহ মুসলিম-হা ৮০৪)

প্রসঙ্গিক ব্যাখ্যাঃ মহান আল্লাহর বাণী-ذَلِكَ الْكِتَابُ لاَ رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ  

সাধারনতঃ (ذَلِكَ)  কোন দূরবর্তী  বস্তুকে ইঙ্গিত করতে ব্যবহৃত হয়। আর (الْكِتَابُ )দ্বারা কুরআনুল কারীমকে  বুঝানো হয়েছে এবং (رَيْبَ ) অর্থ সন্দেহ সংশয়।  আয়াতের অর্থ হচ্ছে- এটি এমন এক কিতাব যাতে সন্দেহ-সংশয়ের  কোন অবকাশ নেই। এটি বাহ্যতঃ দূরবর্তী ইঙ্গিতসূচক শব্দ নয়। কারন এই ইঙ্গিত কোরআনের প্রতি করা হয়েছে, যা মানুশের সামনেই রয়েছে।  কিন্তু দূরবর্তী ইঙ্গিতসূচক শব্দ ব্যবহার করে এ কথাই বুঝানো হয়েছে যে, সুরাতুল ফাতিহাতে যে সিরাতে মুস্তাক্বীম এর প্রার্থনা করা হয়েছিলো- সমগ্র কুরআন সে প্রার্থনারই প্রত্যুত্তর। এটি সিরাতে মুস্তাক্বীম –এর বিস্তারিত ব্যাখ্যাও বটে । (মাওলানা মহিউদ্দিন খান অনূদিত “পবিত্র কূরআনুল কারীম”- বাদশা ফাহাদ কুরআন মুদ্রন প্রকল্প,  মদীনা,১২। )

মহান আল্লাহর বানীঃ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ । মুত্বাকীদের জন্য হিদায়াত বলতে গোমরাহী হতে মুক্তির পথ নির্দেশনা। এটি এমন এক কিতাব যা দ্বারা মু’মিন বান্দা হিদায়াত গ্রহন করবে এবং কাফীর এর উপর হুজ্জত বা দলীল ক্বায়িম হবে। (ইমাম ইবনু জারীর ‘তাফসীর আত ত্বাবারী-১/২৩০।)

সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এখানে মুত্তাক্বী দ্বারা শিরক, কবিরা গুনাহ ও শরীয়াত গর্হিত কার্যাদি মুক্ত মু’মীন বান্দাকে বুঝিয়েছেন। ( আবু মুহাম্মাদ আল-হুসাইন আল-বাগাভীর “তাফসির আল-বাগাভী”-১/৮১)

ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে মুত্তাক্বী দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ সকল ব্যাক্তি , যারা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হতে বিরত থাকে এবং তাদের উপর যা ফরজ করা হয়েছে তা তারা আদায় করে। (হাফিয ইবনু কাসীর”তাফসিরুল কুরআনুল কারীম”-১/১৬৩।)

মহান আল্লাহর বানীঃ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ

এ আয়াতে মুত্তাক্বীদের বিশেষ গুনাবলীসমুহের একটি গুনের কথা উল্লেখিত হয়েছে। আর তা হলো –অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করা । সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেনঃ আল্লাহর ক্বসমঃ গায়িব বা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপনকারীর ন্যায় ই উত্তম ঈমান আনতে পারেনি। (হাফিয ইবনু কাসীর”তাফসিরুল কুরআনুল কারীম”-১/১৬৬, ইমাম শাওকানী “ফাতহুল ক্বাদীর-১/৪১)

আর গায়িব তথা অদৃশ্যে বিশ্বাসের মূলনীতি হচ্ছে-মহান আল্লাহ ও তার রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সকল বিষয়ে ঈমান আনতে বলেছেন, সেগুলোর প্রতি নিঃসংকোচে ঈমান আনা;কোনরুপ কল্পনা বা অপব্যাখ্যায় প্রবৃত্ত না হওয়া। গায়িব এর প্রতি ঈমানের প্রথম ও প্রধান রূকন হলো মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং অন্যতম হলো আখিরাত ও তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন।

মুত্তাক্বী দের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-সলাত ক্বায়িম করা। আর ইক্বামাতে সলাত বলতে ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাতসমুহ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পন্থায় যথা নিয়মে আদায় করা। প্রত্যাশিত ইক্বামাতে সালাত শুধু বাহ্যিক সালাত আদায় করা নয়; বরং সালাতের রূকন, ওয়াজিব সহ বাহ্যিক ইন্দ্রিয় ও আত্মিক নিবিষ্টতা নিয়ে যে সালাত সম্পাদন করা হয় তাকে ইক্বমাতে সালাত বলা হয়। (শাইখ ‘আব্দুর রহমান আস সা’আদি ‘তাইসিরুল কারীমিন রহমান”-৪০)

মহান আল্লাহ্‌র বানীঃ (-----------------------------)

মুত্তাক্বী দের তৃতীয় গুন হচ্ছে- মহান আল্লাহ তাদেরকে যে রিযক দিয়েছেন,তা হতে ব্যয় করা।আর আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় বলতে এখানে ফরয যাকাত,ওয়াজিব সাদাক্বাহ ও নফল  দান খয়রাত প্রভৃতি উদ্দেশ্য। (মাওলানা মহিউদ্দিন খান অনূদিত “পবিত্র কুরআনুল কারীম”-বাদশা ফাহাদ কুরআন মুদ্রন প্রকল্প, মদীনা, ১৪)

আলোচ্য আয়াতে “আমি তাদেরকে যে রিযক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে” দ্বারা একথা বুঝান হয়েছে যে, তোমাদের করায়ত্ব সহায় –সম্পত্তি তোমাদের শক্তি ও যোগ্যতা বলে অর্জিত নয়; বরং এসব তোমাদের রবের তরফ থেকে রিযক মাত্র কাজেই তারই পথে ব্যয় করার মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করো। (শাইখ ‘আব্দুর রহমান আস সা’আদি ‘তাইসিরুল কারীমিন রহমান”-৪০)

আমরা একটু লক্ষ্য করলে দেখতে পাব যে, আল কুরআনের অধিকাংশ জায়গায় সালাত এর সাথে ইনফাক বা যাকাতের কথা উল্লেখিত হয়েছে।সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র হক্ব আদায় হয় এবং যাকাতের মাধ্যমে বান্দাদের পারস্পরিক হক আদায় হয়।ফলে মানুষ ইহকালীন শান্তি শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে এবং পরকালের সাফল্য পেয়ে ধন্য হয়।

মহান আল্লাহ বাণী (--------------------------------)

মুত্তাক্বী দের চতুর্থ গুন ও বৈশিষ্ট হচ্ছে- মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম) এর প্রতি নাযিল হওয়া আল কুরআন ও সুন্নাহ’র প্রতি ঈমান আনা। অত্র আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে সাহাবী ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেনঃ (হে নাবী!) আপনি আল্লাহ্‌র তরফ থেকে যা নিয়ে এসেছেন এবং পূর্ববর্তী রাসূল গন যা নিয়ে এসেছেন, তা তারা সত্য বলে বিশ্বাস করে। তারা নবী ও রাসুলদের প্রতি বিশ্বাসে কোন পার্থক্য করেনা এবং নাযিল কৃত কোন কিছুই অস্বীকার করেনা। (হাফিয ইবনু কাসীর”তাফসিরুল কুরআনুল কারীম”-১/১৭০।)

 

বাকি অংশ নেই