অন্যায় হত্যাযজ্ঞ মানব সভ্যতা ধ্বংসের নামান্তর

  • Jamia Admin
  • Friday 28, 2017
  • প্রবন্ধ

সরল অনুবাদঃ “এ কারনে আমি বানী ইসরাঈলদের প্রতি (অবধারিত বিধানরূপে) লিখে দিয়েছি যে, কোন প্রানের বদলে প্রান ছাড়া কিংবা নিছক ফাসাদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যে কাউকে হত্যা করে সে যেন সমস্ত মানুষকেই হত্যা করে। আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। নিশ্চয়ই তাদের কাছে আমার রাসূলেরা নির্দেশনাবলী নিয়ে এসেছেন। বস্তুতঃ এর পরেও তাদের অধিকাংশ লোক যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে। ” (সুরা আল-মায়িদাহ ৫;৩২)

আয়াতের বিষয় বস্তঃ মানুশ একটি জাতিসত্বার নাম। এর হিফাযত বা সংরক্ষণ অবশ্যক। অনর্থক ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি বড় গর্হিত কাজ। এটি পুরো মানব সভ্যতা ধ্বংসের নামান্তর ।

আলোচ্য আয়াতে সে কথাই বিধৃত হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপটঃ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মানুষ হত্যার ন্যায় জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে আদম (‘আলাইহিস সালাম) এর পুত্র ক্বাবিল । সে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে তার ভাই হাবিল কে হত্যা করে। এ সময় অত্যাচারের শিকার হাবিল মহান আল্লাহর ভয় ও হত্যার অশুভ পরিণাম নিয়ে ভীত ছিল। কিন্তু ক্বাবিল তার ক্রোধ নিয়ন্ত্রন করতে পারেনি। ফলে সে অন্যায় করে বসে এবং আপন ভ্রাতা হাবিল কে নির্মম ভাবে  হত্যা করে। অতঃপর সে তার নিহত ভাই কে কোথায় কিভাবে দাফন করবে, তার দিশা না পেয়ে ভীষন লজ্জায় পড়ে। এ লজ্জার কারন ভাই হত্যার জন্যে অনুশোচনা নয়; বরং দাফনের বিধান না জানার বিড়ম্বনা মাত্র। সে কারনে ক্বাবিল ক্ষমা পায়নি। আর তার এ ঘৃণ্য অপরাধ তাকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে ক্ষতিগ্রস্থ করে। (ডঃ ওয়াহবা আয-যুহায়লী ‘আত তাফসীর আল-মুনীর’ দারুল ফিকহ-দামেস্ক-৩/৫০৯-৫১০, মাওলানা মহিউদ্দিন খান অনূদিত ‘পবিত্র কুরআনুল কারীম’-বাদশা ফাহাদ কুরআন মুদ্রন প্রকল্প- মাদিনাহ/৩২৪।)

প্রাসঙ্গিক জ্ঞাতব্যঃ আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে যে, একজন মানুশ হত্যা যেন গোটা মানব সভ্যতাকে হত্যা করার সমান। এ বিধান জারির সাথে মহান আল্লাহ বাণী ইসরাঈল কে বিশেষায়িত করেছেন। যদিও ঘটনাটি অনেক পূর্বেকার। প্রশ্ন হল- এখানে কেন বানী ইসরাঈল কে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হলো? এর উত্তরে তাফসীর বিশারদগণ বলেছেনঃ বাণী ইসরাঈল এর পূর্বেকার জাতির উপরও মানুষ হত্যা হারাম ছিল। কিন্তু সে আদেশ ছিল অলিখিত। পরবর্তীতে বানী ইসরাঈল মানুষ হত্যার সীমালংঘন করার কারণে তাদের উপর প্রথম লিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ কারনেই তাদের নাম উল্লেখিত হয়েছে।(ইমাম  ইবনু কাসীর ‘তাফসীরুল কুরআনিল কারীম’-৩/৯৩, ইমাম ইবনু জারীর ‘তাফসীর আত তাবারী-১০/২৩১, ডঃ ওয়াহবা আয-যুহায়লী ‘আত তাফসীর আল-মুনীর’ দারুল ফিকহ-দামেস্ক-৩/৫১০)

বিধানটির কার্যকারিতা প্রসঙ্গঃ এটি বাণী ইসরাঈলের প্রতি লিখিত বিধান হলেও মহান আল্লাহ তা আমাদের জন্যে প্রেরিত তার সর্বশেষ ও চুরান্ত আসমানী গ্রন্থ আল কুরআনে উল্লেখ করেছেন। আর ইসলামের নীতি হলো- পূর্ববর্তী বিধান যা কুরআন ও সুন্নাহ সমরথন করে, তা এ উম্মাতের জন্যে বলবত থাকে। কাজেই এটি যুগ পরম্পরায় চলে আসা মহান আল্লাহর অমোঘ বিধান। মানুষ বিচ্ছিন্ন কেউ নয়; বরং এটি একটি জাতিসত্ত্বা বা সভ্যতার নাম। তাই এই মানব সভ্যতা সংরক্ষনের মহান লক্ষে মানুষ হত্যাকে আল্লাহ তা’আলা কুফরি , গর্হিত ও সভ্যতার ধ্বংস বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ইসলামে মানুষ হত্যাঃ ইসলামে মানুষ হত্যা কুফরী। প্রিয় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সল্লাম) বলেনঃ “কোন মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেক্বী কাজ এবং তাকে হত্যা করা কুফরী। ” (সহীহুল বুখারী-হা,৪৮, সহিহ মুসলিম-হা ১১৬।)

মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ যে প্রান হত্যা হারাম করেছেন, তা হত্যা করোনা। তবে হকভাবে।” (সুরা বাণী ইসরাঈল১৭;১৭)

অর্থাৎ- কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ নির্দেশিত বিধানে হত্যাযোগ্য হলে কেবল রাষ্ট্র বা সরকার তা কার্যকর করবে; কোন অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া যাবেনা। মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মানুষ হত্যার পরিনাম জাহান্নাম। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করোনা , নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতিশয় মেহেরবান। আর যে ব্যাক্তি সীমালঙ্ঘন বা জুলুমের বশবর্তী হয়ে এরুপ (হত্যা) করবে, তাকে দ্রুত (জাহান্নামের) আগুনে পৌঁছে দেয়া হবে।”(সুরা আন নিসা ৪,২৯ ও ৩০)

প্রিয় নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “প্রত্যেক মুসলিমের উপর অপর মুসলিম এর রক্ত, সম্পদ, সম্মান হারাম।” (সহিহ মুসলিম হা,২৫৬৪, সুনান আবূ দাঊদ হা,৪৮৮২, সুনান ইবনু মাজাহ হা,৩৯৩৩।)

উপরোক্ত দলিল দ্বারা একথা স্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত যে, মানুষ হত্যা মহা পাপ। আর সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করাও তেমনি হারাম ও গর্হিত কাজ। ইসলাম সর্বতঃভাবে এটা নিষেধ করেছে। শুধু নিষেধই করেনি; বরং এ ধরনের হত্যাকারীকে সমাজচ্যুত বলে আখ্যা দিয়েছে। প্রিয় নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমাদের উপর অস্ত্র ঊত্তোলন করবে , সে আমার উম্মাতভুক্ত নয়।“ (সহীহুল বুখারী হা,৬৮৭৪ ও সহিহ মুসলিম হা,৯৮)

পরিশেষে বলা যায়-প্রতিহিংসা পরায়নতা থেকে হত্যার ন্যায় গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়। আর ইসলাম পরস্পর হিংসা বিদ্বেষ কে খুবই নিন্দনীয় অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আমাদেরকে এহেন কাজ হতে সতর্ক ও সাবধান করেছে।

দারসের শিক্ষা সমুহঃ

০১।হিংসা বিদ্বেষ হত্যার ন্যায় গুরুতর অপরাধ ঘটাতে উৎসাহ যোগায়। যেমনটি করেছিলো আদম (আলাইহিস সালাম) পুত্র ক্বাবিল। আর এটি ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম মানব হত্যা।

০২।কোন সীমালঙ্ঘনকারীর পরিণতি কখনোও ভালো হয়না। যেমন বাণী ইসরাঈল ও তার দোসররা। বরতমানেও যারা পৃথিবীতে অনর্থক বিপর্যয় সৃষ্টি করে চলছে।

০৩। একজন মানুষ একটি সভ্যতার প্রতিবিম্ব। তাই একজন মানুষ হত্যা মানে পুরো মানব সভ্যতাকে হত্যা করা।

০৪। নিরাপদ ও সান্ত সমাজে ফাসাদ সৃষ্টিকারী ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজচ্যুত। সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারায়।

০৫। অপরের জান ও মালের নিরাপত্তা দেউয়া প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব। নিজে নিরাপদ থাকি অপরকে নিরাপদ থাকতে দেই।

 

--শাইখ মুহাম্মাদ হারুন হুসাইন