মুনাফিক্বদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

  • Jamia Admin
  • Tuesday 03, 2017
  • প্রবন্ধ

মহান আল্লাহর বানীঃ “আর মানুশের মাঝে এমন কিছু লোক আছে, যারা বলে আমরা আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান এনেছি; অথচ তারা আদৌ ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহ ও ঈমানদারদেরকে ধোঁকা দেয়। তারাতো নিজেদের ছাড়া আন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না; অথচ তারা বুঝে না। তাদের অন্তরসমূহ ব্যাধিগ্রস্ত, আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের মিথ্যাচারের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। আর যখন তাদেরকে বলা হয় –তোমরা দুনিয়ায় ফাসাদ সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরাতো কেবল মীমাংসাকারী। আর যখন তাদেরকে বলা হয়- অন্যান্যরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো। তখন তারা বলে, আমরা কি বোকা লোকদের মতো ঈমান আনব। মনে রেখ, প্রকৃতপক্ষে তারাই বোকা; কিন্তু তারা বুঝে না। আর যখন তারা ঈমানদারদের সাথে মিশে, তখন বলে আমরা ঈমান এনেছি। আবার যখন তাদের শয়ত্বানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে আমরা তোমাদের সাথে রয়েছি- আমরাতো (মুসলিমদের সাথে) উপহাস করি মাত্র। আল্লাহ-ই তাদের সাথে উপহাস করেন। আর তিনি তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছেন, যাতে তারা নিজেদের সীমালঙ্ঘনের মাঝে হয়রান পেরেশান হয়। আর তারা সে সমস্ত লোক, যারা হিদায়াতের বিনিময়ে গোমরাহী খরিদ করেছ। বস্তুতঃ তারা তাদের এই ব্যবসায় লাভবান হয়নি। আর তারা হিদায়াত প্রাপ্তও নয়” (আল-কুরআনঃ সূরা আল-বাক্বারাহ ৮-১৬) 

দারসের বিষয়বস্তুঃ আলোচ্য দারসে উল্লেখিত আয়াতসমুহে মুনাফিক্বদের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। তারা দুনিয়াদার, প্রতারক ও একান্ত স্বার্থপর। অন্তরে কুফরী লালন করে কেবল পার্থিব স্বার্থ হাসিলের কুমতলবে বাহ্যিক আমলকারী মাত্র। ্মহান আল্লাহ ও তার রাসূল এবং ইমানদারদের নিয়ে বিদ্রুপকারী, মুনাফিক্বরা প্রকৃত আত্মপ্রবঞ্চণার গ্লানিতে নিমজ্জিত। এহেন সুবিধা ভোগি দ্বৈত নীতির মানুষরা মুলত নিজেদের ক্ষতি সাধন করে। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় কুল হারায়। এতদসত্বেও নিজেদেরকে খুব বুদ্ধিমান মনে করে। এসব কথা উল্লেখিত আয়াতসমুহে আলোচনা করা হয়েছে।

মুনাফ্বিক কারা?

মুনাফ্বিক  কর্তৃ বাচ্য বিশেষ্য। অর্থঃ  কপটবিশ্বাসী । এটির ধাতুগত অর্থ হচ্ছে- দু’ মুখ বিশিষ্ট সুড়ঙ্গ পথ, যার একদিক দিয়ে প্রবেশ করে, অপরদিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়। সেই  অর্থে মুনাফিক্ব বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে, যার ভিতর ও বাহির এক নয়। শরী’আতের পরিভাষায় ইসলাম ও বাহ্যিক কল্যান প্রকাশ করা এবং কুফরি ও অনিষ্টচিন্তা লুক্বায়িত রাখাকে নেফাক্বী বা কপটতা বলে। আর যে ব্যক্তিএরূপ ‘আক্বিদাহ পোষণ করে তাকে মুনাফিক্ব বলা হয় (ডঃ সালেহ আল-ফাওযান ‘আক্বীদাতুত তাওহীদ’-১০৫ পৃষ্ঠা) 

মুনাফিক্বদের পরিনতিঃ মুনাফিক্বরা কাফিরের চেয়েও গুরুতর পাপী। কেননা এরা প্রতারক। এদের কপটতা কাফিরকেও হার মানায়। সেজন্য মহান আল্লাহ এদেরকে মিথ্যাবাদী বলে স্বাক্ষ্য দিয়েছেন (সূরা আল- মুনাফিক্বুন ১)। এদের পরিণতি কাফিরদের চেয়েও ভয়াবহ। এরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন গভীরে পতিত হবে (সূরা আন নিসা ১৪৫)

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাঃ মহান আল্লাহর বাণী – “মুনাফিক্বদের ঈমানের দাবী নিছক প্রতারনা। তারা মহান আল্লাহকে ধোঁকা দেয়” এ কথার অর্থঃ তারা আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লা-হু “আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর অনুসারী মুসলিমদের সাথে ধোঁকাবাজি করে। বস্তুতঃ আল্লাহকে কেউ ধোঁকা দিতে পারেনা” (সুনান আবূ মুহাম্মাদ আল –হুসাইন আল-বাগাভী ‘তাফসীর আল- বাগাভী-ইহইয়াউত তুরাছ- ১/৮৭, তাফসীর আল-কুরতুবী-১/১৯৫) 

মহান আল্লাহর বানীঃ “অসুস্থতা দেহে মনে হয়ে থাকে”। এখানে মহান আল্লাহ মুনাফিক্বদের মনের ব্যাধির কথা উল্লেখ করেছেন । তাদের মনের ব্যাধি হল সন্দেহ । বিশুদ্ধ মতে তাদের অন্তর্নিহিত কুফরীকে বুঝানো হয়েছে। আর মুনাফিক্বরা সবসময় এই ভয়ে থাকে যে, না জানি কখন কোথায় তাদের  প্রকৃতস্বরূপ  প্রকাশ হয়ে পড়ে । দিবা-রাত্রি এ চিন্তায় ব্যস্ত থাকাটাও একটা বড় মানসিক রোগ। আর মহান আল্লাহ আয়াত সমুহ পর পর নাযিল করে ঈমানের প্রতি আহ্বান জানানোতে তারা আরো বেশী উৎকণ্ঠা বোধ করে এবং কুফরীর পর কুফরী বাড়তে থাকে (ইমাম ইবনু জারীর আত তারাবী ‘জামিউল বায়ান’ ১/২৭৯) । কারো মতে ‘আল্লাহ তাদের রোগ আরো বাড়িয়ে দেন’- এর অর্থ এই যে, তারা ইসলাম ও মুসলিম দের উন্নতি দেখে জ্বলে-পুড়ে ছাই হতে থাকে।

মহান আল্লাহর বানীঃ “মুনাফিক্ব রা ফিৎনা-ফাসাদ কে মীমাংসা এবং নিজেদেরকে মীমাংসাকারী মনে করে”। আল- কুরআন পরিষ্কার ভাবে বলে দিয়েছে যে, এটি মৌলিক দাবীর উপর নির্ভরশীল নয়; বরং ব্যাপারটি ব্যক্তি বা ব্যক্তি  সমষ্টির আচরনের উপর একান্ত নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ যদি ফিৎনা-ফাসাদ সৃষ্টির কারন হয়, তাহলে এসব কাজ যারা করবে তাদেরকে প্রকৃত ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টিকারি বলতে হবে। মুনাফিক্ব রা তাদের দ্বিমুখী নীতি ও কর্ম দ্বারা সমাজে ফাসাদ সৃষ্টি করে চলেছে। যদিও তা তারা স্বীকার করতে নারাজ। মহান আল্লাহর বানীঃ “.......” এ আয়াতে মুনাফিক্বদের আরো একটি ধৃষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা হলো ঈমানদার সাহাবী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)- দেরকে নির্বোধ ও বোকা বলা। মুলতঃ সাহাবী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)- দের ঈমানই খাঁটি ঈমান। মহান আল্লাহর কাছে অনুরূপ ঈমানই গ্রহণযোগ্য। কাজেই কোন ব্যক্তির নিজেকে প্রকৃত ঈমানদার দাবী করতে হলে সাহাবা দের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মতো ঈমান আনতে হবে;অন্যথায় ঈমানের দাবী যথার্থ হবেনা। সে যুগের মুনাফিক্বরা সাহাবী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)- দেরকে বোকা বলে আখ্যায়িত করেছিল। বস্তুতঃ এ ধরনের গোমরাহী সকল যুগেই চলে আসছে। যারা ভ্রষ্ট কে পথ দেখায় , তাদের ভাগ্যে সাধারনতঃ বোকা, অশিক্ষিত, মূর্খ প্রভৃতি আখ্যা জুটে থাকে। কিন্তু আল কোরআন পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছে- “ঐ সকল অলীক বিশ্বাসীরাই প্রকৃত বোকা। কেননা এমন উজ্জ্বল ও প্রকাশ্য নিদরশনাবলী থাকা সত্বেও তাতে বিশ্বাস স্থাপন করার মত জ্ঞ্যান-বুদ্ধি তাদের নেই”

ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তাদেরকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথীরা যেভাবে ঈমান এণেছে, ঠিক সেভাবে ঈমান আনতে আহ্বান করা হলে তারা সাহাবী দেরকে (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নির্বোধ আখ্যা দিয়ে ঈমান গ্রহন হতে বিরত থাকে। মহান আল্লাহ তাদেরকেই প্রকৃত নির্বোধ, অজ্ঞ ও জাহেল হিসেবে চিহ্নিত করেন। তারা যে নিরেট বোকা একথা বুঝার জ্ঞ্যান ও তাদের নেই (ইমাম শাওকানী ‘ফাতহুল ক্বাদীর’-১/৫১) 

মহান আল্লাহর বানীঃ “মুনাফিক্বদের আরো একটি চরিত্র হল- তারা দ্বি-মুখী, স্বার্থপর, ও সুবিধাভোগী” । মুসলিমদের সাথে দেখা হলে ঈমানের ছলনা করে।আর কাফির- মুশরিক নেতাদের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করে মনের আসল কথা বলে। নেতা দের বুঝাতে চায়- আরে আমরাতো তোমাদের খাঁটি লোক। প্রকাশ্যে ঈমানের কথা বলে কেবল মুসলিম তথা সাহাবী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)- দেরকে নিয়ে বিদ্রুপ করি মাত্র। আর এটাই হচ্ছে মুনাফিক্বদের দ্বি-মুখী নীতির স্বরূপ (শাইখ আবদুর রহমান আস সা’আদী ‘তাইসীরুল কারীমিন রহমান-৪৩) 

মহান আল্লাহর বানীঃ  “.......” সুদ্দী সাহাবী ইবনু আব্বাস, ইবনু মাস’ঊদ সহ কয়েকজন সাহাবী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)- থেকে বর্ণনা করেনঃ “মুনাফিক্বরা হিদায়াতের পরিবর্তে গোমরাহী কে গ্রহন করেছে। অপর বর্ণনায় ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)- গোমরাহী দ্বারা কুফরীকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ তারা ঈমানের বদলে কুফরী খরিদ করেছে (হাফিয ইবনু কাসীর ‘তাফসিরুল কুরআনিল কারীম’-১/৮৫) 

মুনাফিক্বদের ব্যবসা নিষ্ফল। তারা তারা মুল্যবান  সম্পদ ঈমান- এর বিনিময়ে নিকৃষ্ট বস্তু কুফরীকে গ্রহন করল। ফলে তারা এ ব্যবসায় লাভবান হতে পারলোনা; বরং প্রকাশ্য ক্ষতিতে নিপতিত হলো। আর আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়াত হারানোই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ততা (আত তাফসীর আল- মুয়াসসার-১/৪)

দারসের শিক্ষাসমূহঃ

০১। মৌখিক স্বীকৃতির নাম কেবল ঈমান নয়; অন্তরে বিস্বাস এবং কর্ম দ্বারা এটার দাবী বাস্তবায়নই ঈমান। আর তা সঠিক আমলের দ্বারা বৃদ্ধি পায় এবং ‘আমল না করলে কমে যায়।

০২। মহান আল্লাহ, তার রাসুল (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও কুরআনের সাথে প্রতারণা করে কেউ সফলকাম হতে পারেনা;তারা নিজেরাই নিজেদের পাপের কারনে লাঞ্ছনার স্বীকার হয়।

০৩। মুনাফিক্বরা কুফরীর পর কুফরী করে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ায়। তার এটিই হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা অভিশাপ।

০৪।যমীনে সৃষ্ট ফাসাদের মধ্যে প্রধান ও মারাত্মক ফাসাদ হল শিরক অ কুফরী। মুনাফিক্বরা এ দু’অপরাধে লিপ্ত থেকেও তারা মীমাংসার মিথ্যে আস্ফালন করে। আর সকল যুগেই মুনাফিক্বরা একই চরিত্রের অধিকারী হয়।

০৫। মহানবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও সাহাবিগনের (রাযিয়াল্লাহু আনহু)- অনুসৃত পথ অবলম্বন ছাড়া কখনোও প্রকৃত হিদায়াত লাভ করা যাবেনা। কোন ‘আমল করার পূর্বে সালাফে সালেহীন –এর পথ অনুসন্ধান করা আবশ্যক।নতুবা আখিরাতের ব্যবসায় সফল হওয়া যাবেনা।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে খাঁটি ইমানদার হওয়ার তাওফিক্ব দিন এবং মুনাফিক্বদের অনিশ্তভতে হিফাযত করুন-আমীন।